শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সম্পাদকীয়

শুরু হলো বাঙালির প্রাণের মাস ‘ফেব্রুয়ারী’

শুরু হলো বাঙালির প্রাণের মাস ‘ফেব্রুয়ারী’

আজ ১ ফেব্রুয়ারি। বাঙালি জাতির অনন্য গৌরবের ফেব্রয়ারী মাসের প্রথম দিন আজ। ১৯৫২ সালের এ মাসেই বাঙালি জাতি গর্জে উঠেছিল মায়ের ভাষার মান রাখার দাবিতে। সেই থেকে ফেব্রুয়ারি এলেই বাঙালি জাতির প্রাণের আরাধনা শুরু হয়। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...’ কালজয়ী এ গানের সুর আজ থেকে আবারো ছড়িয়ে পড়বে দেশজুড়ে। গানটির সুরে মোহিত হয়ে জাতি ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগের বিরল ইতিহাস স্মরণ করবে। আজ থেকে ৬৩ বছর আগে মায়ের ভাষার মান রাখতে বাঙালি জাতি যেভাবে গর্জে উঠেছিল পৃথিবীর ইতিহাসে তা ছিল এক বিরল ঘটনা। এ সময় জুড়ে ইতিহাসের গৌরবজনক এই ঘটনা বাঙালিকে অনুপ্রেরণা ও সাহস দিয়ে চলেছে। মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে এ মাসেই হাসতে হাসতে বুকের তাজা রক্ত দিতে পিছপা হননি সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অনেক বাঙালি। তাদের সে আত্মত্যাগ সারাবিশ্বের ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে আছে। ভাষার এই মাস ঘিরে বাঙালি জেগে উঠবে নতুন উদ্দীপনায়। শোককে শক্তিতে পরিণত করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার নতুন আয়োজন শুরু করবে এ মাসকে সামনে রেখে। আজ থেকে শুরু হয়ে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে চলবে ভাষার মাসের নানা আয়োজন। অনুষ্ঠানমালার মধ্যে সবচেয়ে বড় আয়োজন অমর একুশে গ্রন্থমেলা। পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়ে এ আয়োজন চলবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিন পর্যন্ত। বাংলা একাডেমি চত্বর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একাংশজুড়ে চলা এ গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনাও থাকবে। আমার মায়ের ভাষা তথা বাংলা ভাষার প্রতি বাঙালি জাতির ভালোবাসা চিরন্তন। সে ভালোবাসার অনুরণন প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক শক্তিশালী হয়ে। মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিমের কবিতায় শোনা যায়, ‘যেজন বঙ্গেতে জšি§ হিংসে বঙ্গবাণী, সেজন কাহার জš§ নির্ণয় ন জানি...।’ কবির এ উচ্চারণ থেকে বাংলা ভাষার প্রতি দরদের যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা বাঙালির হƒদয়ের গভীর থেকে প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হচ্ছে। সে কারণে ভাষা আন্দোলনকে প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, ‘ভুলবো না ভুলবো না লাঠি গুলি টিয়ারগ্যাস ভুলবো না’, ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ ইত্যাদি সব কালজয়ী গান ও কবিতা। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় একসময় অমর একুশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের কাছে কানাডা প্রবাসী দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল সে আওয়ামী লীগের আমলেই আন্তর্জাতিক এ স্বীকৃতি অর্জন করে বাঙালি তথা বাংলাদেশ। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোতে পালিত হচ্ছে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাাবটি সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে উত্থাপন করে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের তথ্যবিষয়ক কমিটিতে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। তারপর থেকেই সারা বিশ্বের কাছে গৌরবময় এক ভাষা হিসেবে মর্যাদা লাভ করে বাংলাভাষা। এই ভাষা, এর ইতিহাস এবং ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের সর্বজনীন একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।